বিশ্ববাজারে কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাম

দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়, এখনো কাটেনি সরবরাহ সংকট

বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিম্নমুখী। বিশেষ করে টানা কয়েক মাস অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম কমেছে। তবে দেশে শুল্কজনিত অস্থিতিশীলতায় নিত্যপণ্যটির দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী।

বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিম্নমুখী। বিশেষ করে টানা কয়েক মাস অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম কমেছে। তবে দেশে শুল্কজনিত অস্থিতিশীলতায় নিত্যপণ্যটির দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম কমলেও বোতলজাত ও খোলা সয়াবিনের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চালাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানিকারকদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারিভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়ায় সরবরাহ সংকট এখনো কাটেনি।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের মধ্যে সয়াবিনের বুকিং দর কমলেও পাম অয়েলের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভোজ্যতেল আমদানিতে ১ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করায় পণ্যটির দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১২০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। মিল মালিকরা বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়াতে প্রস্তাব দেয়ায় দাম বাড়ানোর গুজবে বাজারে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেলে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মিলগুলো থেকে পর্যাপ্ত বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ না পাওয়ায় খুচরা বাজারে সয়াবিনের সংকট দেখা দিয়েছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক মাস আগেও খোলা পরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ছিল মণপ্রতি ৫ হাজার ৯০০ টাকা। তবে সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যটির দাম মণপ্রতি ১৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৬ হাজার ৩০ থেকে ৬ হাজার ৪০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। অন্যদিকে সয়াবিনের দাম একই সময়ের ব্যবধানে দাম প্রায় দেড়শ টাকা বেড়ে লেনদেন হচ্ছে ৬ হাজার ৮০০ টাকায়। একই সময়ে বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম কমে এলেও বোতলজাত ও খোলা সয়াবিনের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় এবং সরবরাহ সংকটের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা দাম কমছে না।

পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হলে মিল মালিকদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েক দফা বৈঠক হয়। বৈঠকে আলোচনা হলেও এখনো দাম বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এরই মধ্যে মিল মালিকদের অনেকেই দেশের বাজারে ডিলার পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ বন্ধ করে দেন। এছাড়া বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে কয়েকটি মিলে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে পাম অয়েল ও সয়াবিন অয়েলের দাম বেড়ে গেছে। এছাড়া মিল থেকে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ চাহিদা অনুপাতে না থাকায় বাজারে লিটারভেদে সয়াবিনের সংকট তৈরি হয়েছে।

খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যে মিল মালিকরা আগের দামে মোড়কজাত সয়াবিনের সরবরাহ দিয়ে লোকসানে পড়তে চাইছেন না। এ কারণে ডিলার ব্যবসায়ীরা চাহিদাপত্র দিলেও তাদের ডিও (সরবরাহ আদেশ) দেয়নি অনেক মিল কর্তৃপক্ষ। এজন্য পাইকারি ও খুচরা বাজারে এখনো বিভিন্ন পরিমাণের সয়াবিনের সংকট রয়েছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দাম বৃদ্ধি পাবে এমন আশ্বাসে আগের মোড়কের ভোজ্যতেল বাড়তি দামে ব্যবসায়ীদের সরবরাহ দিচ্ছেন। মুনাফা ধরে রাখতে ব্যবসায়ীরাও মোড়কের চেয়ে বেশি দামে খুচরা পর্যায়ে ভোজ্যতেল বিক্রি করছেন বলে স্বীকার করেছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিশ্ববাজারে দাম কমে গেছে। এখন দাম বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কিনা বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভেবে দেখবে। খোলা ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে দামের ওঠানামা হয়। কিন্তু বোতলজাত সয়াবিন মিল মালিকরা সরবরাহ না দিলে বাজারে এর প্রভাব নেতিবাচক হয়। অনেক সময় সরকারকে চাপে রাখতে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় হাঁটেন আমদানিকারকরা।’

বিশ্বব্যাংকের ২ অক্টোবরের পিংকশিট কমোডিটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম কমেছে টনপ্রতি ১৪৫ টাকা। জুলাই জুড়ে বিশ্ববাজারে সয়াবিনের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৩০৭ ডলার, আগস্টে ১ হাজার ২৪৫ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে সয়াবিনের দর ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৬২ ডলার। যদিও অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম কিছুটা বেড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৩৮ ডলারে লেনদেন হয়েছে (সেপ্টেম্বর)।

এদিকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম কমার চিত্র উঠে এসেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও। ২৪ সেপ্টেম্বরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৭ সেপ্টেম্বরের তুলনায় অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম টনপ্রতি ৭৮ দশমিক ৭১ ডলার কমে ১ হাজার ৩২ ডলারে লেনদেন হয়েছে। একইভাবে অরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ১০ ডলার কমে ১ হাজার ৭২ ডলারে লেনদেন হয়েছে। সর্বশেষ ৩ অক্টোবর সয়াবিনের বুকিং দর ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ২৩ ডলার এবং পাম অয়েলের দাম আরো কমে ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৫৫ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিশ্ববাজারে বুকিং দর কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ ছিল চাহিদার তুলনায় কম। দুর্গা পূজার ছুটিতে চাহিদা কিছুটা বাড়লেও সরবরাহ সংকটে কিছুটা বাড়তি দামেই সয়াবিন, পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে। তবে পূজার চাহিদা শেষ হয়ে আসায় বাজারে সরবরাহ কম থাকলেও সংকট হচ্ছে না। বিশ্ববাজারে দাম কমে আসায় কয়েক দিন ধরে মিল মালিকরা ভোজ্যতেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়েছেন। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে চূড়ান্ত সিদ্বান্ত না এলে ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটবে না বলে মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানিতে উৎসে কর আরোপ ছাড়াও বৈশ্বিক দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন একই দামে থাকা ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এখন দাম বাড়বে নাকি কমবে সেটি নির্ধারণ করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দাম নিয়ে সিদ্ধান্ত যাই আসুক না কেন মিল মালিকরা নিয়মিত সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে বাড়তি দামে ক্রয় করা ভোজ্যতেলও আগের দামে সরবরাহ করা হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়ানো হয়েছিল। দাম বাড়িয়ে লিটারপ্রতি সয়াবিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৭৫ টাকা। যদিও একদিন পর ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সয়াবিনের আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর (এআইটি) ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়। পাম অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে এআইটিতে এ সুবিধা পান আমদানিকারকরা।

আরও